জনাব আলিফ সাহেব আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ। তবে তার দুর্ভাগ্য হলো তিনি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতে জানেন না। ছোটবেলায় তার পিতা-মাতা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কারণে তার পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত শেখা হয়ে ওঠেনি। অবশ্য বড় হওয়ার পর ব্যস্ততার অজুহাতে তিনি নিজেও কখনো তা শেখার চেষ্টা করেননি। তার বন্ধু জনাব জামিল বললেন, কুরআন না শিখে তুমি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার থেকে বঞ্চিত হয়েছ।
মুত্তাকি' বলতে আল্লাহভীরু লোকদের বোঝায়। মুত্তাকি শব্দের অর্থ আল্লাহভীরু বা পরহেজগার। জন্মগত বা বংশগত কারণে কারো পক্ষে মুত্তাকি হওয়া সম্ভব নয়। মুত্তাকি হতে হলে কিছু বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন। সুরা বাকারার আলোকে সেগুলো হলো অদৃশ্য বিষয়ের অস্তিত্বে বিশ্বাসী হতে হবে। সব হুকুম-আহকাম পালনের মাধ্যমে সালাত কায়েম করবে। তাকে আল্লাহ যে রিজিক দিয়েছেন তা থেকে মানুষের কল্যাণে অর্থ ব্যয় করবে।
জনাব জাহিদ কুরআন অবতরণের পদ্ধতির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। আল-কুরআন সর্বপ্রথম লাওহে মাহফুজ বা সুরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ ছিল। তারপর আল্লাহ তায়ালা লাওহে মাহফুজ থেকে কুরআন অবতরণের সূচনা করেন। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে মহানবি (স) হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকাবস্থায় মহান আল্লাহর নির্দেশে জিবরাইল (আ)-এর মাধ্যমে আল-কুরআনের সুরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নিয়ে মহানবি (স) এর কাছে অবতরণ করেন। যা উদ্দীপকের জনাব জাহিদের বক্তব্যে ফুটে ওঠে।
উদ্দীপকের জাহিদ পবিত্র কুরআনের অবতরণ পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করে বলেন, এটা একবারে নাজিল বা অবতীর্ণ হয়নি এবং বিভিন্ন পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হয়েছে। এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেন, 'লাওহে মাহফুজ থেকে সমগ্র কুরআন কোনো এক কদরের রাতে পৃথিবীর আকাশের 'বায়তুল ইযযাহ' নামক স্থানে নাজিল হয়। বায়তুল ইযযাহ হলো বায়তুল মামুরের অপর নাম। এটি বায়তুল্লাহ বরাবর পৃথিবীর নিকটবর্তী আকাশে ফেরেশতাদের ইবাদতগৃহ। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে রাসুল (স)-এর প্রতি ধীরে ধীরে প্রয়োজন মতো অল্প অল্প অংশ নাজিল হয়ে দীর্ঘ তেইশ বছরে এ নাজিল প্রক্রিয়া পূর্ণতা পায়' (আল-ইত্কান, বায়হাকি)। রাসুল (স) এর ওপর স্বপ্নযোগে, ঘন্টাধ্বনিতে, জিবরাইল (আ) নবিজির অন্তরে কুরআন ঢেলে দেওয়ার মাধ্যমে, জিবরাইল (আ) এর নিজস্ব আকৃতিতে নবিজির কাছে ওহি নিয়ে অবতরণ, সরাসরি আল্লাহর সাথে কথোপকথন প্রভৃতি মাধ্যমে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। সুতরাং জনাব জাহিদ এসব পদ্ধতিরই ইঙ্গিত করেছেন।
আদর্শ জাতি গঠনে পবিত্র কুরআনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে- জনাব নাহিদের এ বক্তব্যের সাথে আমি একমত পোষণ করি। পবিত্র কুরআন সর্বশেষ আসমানি কিতাব। মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স) এর নবুয়ত জীবনের সুদীর্ঘ তেইশ বছরে এটা অবতীর্ণ হয়েছিল। কুরআনে মানবজীবনের সবকিছুর সমাধান রয়েছে। যা নাহিদের বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে।
উদ্দীপকের জনাব নাহিদ আদর্শ জাতি গঠনে কুরআনের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করেন। কুরআন মাজিদ বিশ্বমানবের সুষ্ঠু ও সুন্দর জীবননির্বাহের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-ব্যবস্থাপনা। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ব্যক্তিজীবন হতে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ও বিভাগে মানব সমস্যার অন্ত নেই। মানবজাতিকে এ সমস্যার আবর্ত হতে পরিত্রাণ করে সুষ্ঠু- শান্তিময় ও উদ্বেগহীন জীবন পরিচালনার জন্য আল্লাহ তায়ালা সর্বশেষ নবি হযরত মুহাম্মদ (স) এর প্রতি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব আল-কুরআন নাজিল করেছেন। তিনি মানবজীবনের সব সমস্যার সমাধান এই মহাগ্রন্থে উপস্থাপন করেছেন।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- আর আমি তোমার ওপর কিতাব নাজিল করেছি যা প্রতিটি বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা সম্বলিত, হেদায়েত, রহমত এবং সুসংবাদ-মুসলিম জাতির জন্য (সুরা নাহল: ৮৯)। রাসুলুল্লাহ (স) তাঁর বিদায় হজের ভাষণে এজন্যই বলেছেন- 'আমি তোমাদের মাঝে দুটো বিষয় রেখে যাচ্ছি। যদি তোমরা এ দুটোকে আঁকড়ে ধর, কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। একটা হলো আল্লাহর কিতাব এবং অপরটি তাঁর রাসুলের সুন্নত' (মিশকাত)। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের পরিপূর্ণ অনুসরণ করার মাধ্যমে আদর্শ ও কল্যাণকর জাতি গঠন করা সম্ভব।
স্বকীয় উপস্থাপনা ও আলোচ্য বিষয়ের বৈচিত্রের কারণে কুরআন সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ গ্রন্থ। আল-কুরআন আল্লাহর কালাম। এর রচনাশৈলী ও বিষয়বিন্যাস স্বতন্ত্র। এর প্রকাশরীতি, ব্যঞ্জনা, অভিব্যক্তি ও আবেদন অনুপম। এর ভাষা অনন্য। এ গ্রন্থ বিষয়ভিত্তিক ধ্যান-ধারণায় রচিত নয়। স্বকীয় উপস্থাপনা ও বিষয়বৈচিত্র্যের কারণে কুরআন অনবদ্য। বিশিষ্টতা পেয়েছে। আল-কুরআন সর্বজনীন ও সর্বকালীন এক চিরন্তন সত্য মহাগ্রন্থ। এ গ্রন্থের সংশয়হীনতা ও অভ্রান্ত নির্দেশনা এতটাই সুনিশ্চিত ও অকাট্য যে, তা সব কালের ও সব দেশের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। তাছাড়া পবিত্র কুরআনের ভাষাচয়ন লক্ষ করলে দেখা যায়, এটা সম্পূর্ণ পদ্য কিংবা পুরোপুরি গদ্য নয়। বরং এ দুয়ের সংমিশ্রণে নাজিল এক অভূতপূর্ব গ্রন্থ- যা এ গ্রন্থটির উচ্চ মর্যাদা প্রকাশ করে।